
নলডাঙ্গা গ্রামটা ম্যাপে খুব একটা উজ্জ্বল নয়। বর্ষায় কাদা আর গরমে ধুলোর রাজ্যে বাস করা মানুষগুলোর কাছে জীবন মানেই লড়াই। এই গ্রামেই এক জীর্ণ কুটিরে বাস করতেন রাবেয়া বেগম। স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর যখন চারদিকের অন্ধকার তাঁকে গ্রাস করতে এসেছিল, তখন তাঁর কোলে ছিল পাঁচ বছরের ছেলে আয়ান। সহায়-সম্বল বলতে ছিল ভিটেমাটির এক চিলতে জমি আর একরাশ আত্মসম্মান। রাবেয়া বেগম সাধারণ গ্রাম্য নারী হলেও তাঁর শিরদাঁড়া ছিল ইস্পাতের মতো শক্ত। লোকের বাড়িতে ধান ভানা, নকশি কাঁথা সেলাই করা থেকে শুরু করে তপ্ত দুপুরে পরের জমিতে নিড়ানি দেওয়া—কোনো কাজকেই তিনি ছোট মনে করেননি। তাঁর জীবনের একটাই লক্ষ্য ছিল আয়ানকে মানুষের মতো মানুষ করা।
আয়ান যখন প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হলো, রাবেয়া তখন থেকেই তাকে একটা কথা শিখিয়েছিলেন,
“বাবা, পেট খালি থাকলেও মন যেন ছোট না হয়। মিথ্যে বলে পাওয়া রাজপ্রাসাদের চেয়ে সত্যি বলে পাওয়া কুঁড়েঘর অনেক বেশি শান্তির।”
সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। অনেক রাতে এমন হয়েছে যে, ভাতের হাঁড়িতে পর্যাপ্ত চাল নেই। রাবেয়া আয়ানকে পেট ভরে খাইয়ে নিজে জল খেয়ে শুয়ে পড়েছেন। আয়ান যখন জিজ্ঞেস করত,
“মা, তুমি খেলে না?” রাবেয়া হাসিমুখে বলতেন, “আমার খিদে নেই রে বাজান, বিকেলে প্রতিবেশীর বাড়িতে মুড়ি খেয়েছি।”
আয়ান ছোট হলেও মায়ের এই ‘মিথ্যে’র আড়ালের ত্যাগটুকু বুঝতে শিখছিল। একবার গ্রামের মাতব্বর হারুন মিয়া রাবেয়াকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাঁর গুদামে চাল চুরির হিসেবে সাহায্য করতে, বিনিময়ে মাসে মোটা টাকা দেবেন। রাবেয়া সেদিন শান্ত গলায় বলেছিলেন,
“হারুন ভাই, আমার ছেলের রক্তে আমি অসততার অন্ন মিশতে দেব না। উপোস থাকব, তবু পাপের পথে পা বাড়াব না।”
সেই তেজ দেখে মাতব্বর দমে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু গ্রামে রাবেয়ার কাজ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবুও তিনি হার মানেননি। আয়ান ছিল অত্যন্ত মেধাবী। স্কুলে তাঁর রেজাল্ট দেখে শিক্ষকরা অবাক হয়ে যেতেন। কিন্তু মাধ্যমিক শেষ করার পর আসল পরীক্ষা শুরু হলো। বিজ্ঞানের বইয়ের দাম, প্রাইভেট পড়ার খরচ—সব মিলিয়ে এক পাহাড় সমান দুশ্চিন্তা। রাবেয়া তখন নিজের শেষ সম্বল, মায়ের দেওয়া একজোড়া সোনার চুড়ি বিক্রি করে দিলেন। আয়ান যখন কেঁদে ফেলেছিল, রাবেয়া তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন,
“বইয়ের ভেতরে যে সম্পদ আছে আয়ান, তার কাছে এই সামান্য সোনার কোনো দাম নেই। তুই শুধু মন দিয়ে পড়।”
আয়ান উচ্চমাধ্যমিকে অভাবনীয় ফল করল। মেধা তালিকায় তাঁর নাম আসায় পুরো গ্রাম ধন্য ধন্য করতে লাগল। কিন্তু মেডিকেল কোচিং আর ফরম ফিলাপের টাকার জোগাড় কীভাবে হবে? রাবেয়া এবার আরও কঠোর পরিশ্রম শুরু করলেন। দিনের বেলা অন্যের জমিতে কাজ করে রাতে লণ্ঠনের আলোয় নকশি কাঁথা সেলাই করতেন। চোখের জ্যোতি কমতে শুরু করেছিল, আঙুলগুলো সুঁচের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যেত, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল অবিচল। অবশেষে সেই দিনটি এল। আয়ান দেশের সেরা সরকারি মেডিকেল কলেজে সুযোগ পেল। যেদিন খবরের কাগজে আয়ানের নাম এল, সেদিন রাবেয়া বাড়ির পেছনের আমতলায় গিয়ে অঝোরে কেঁদেছিলেন। সেই কান্না দুঃখের নয়, সেই কান্না ছিল এক অপরাজেয় সংগ্রামের সার্থকতার। মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় আয়ান অনেকবার দেখেছে তাঁর বন্ধুরা দামি রেস্টুরেন্টে খাচ্ছে, ব্র্যান্ডের জামা পরছে। আয়ানের ছিল তালি দেওয়া একটা ব্যাগ আর ধোয়া পুরোনো শার্ট। কিন্তু মায়ের শেখানো সততা তাঁকে কখনও হীনম্মন্যতায় ভুগতে দেয়নি। ছুটিতে বাড়ি গেলে সে দেখত মা আরও শুকিয়ে গেছেন। মায়ের হাতের কড়াগুলো তাকে মনে করিয়ে দিত, এই ডাক্তার হওয়ার পেছনে কার রক্তজল করা পরিশ্রম মিশে আছে। আয়ান যখন এমবিবিএস শেষ করে ডাক্তার হলো, তখন তাঁর সামনে অনেক বড় বড় সুযোগ। শহরের নামী হাসপাতাল থেকে আকর্ষণীয় বেতনের প্রস্তাব এল।বন্ধুরা বলল,
“আয়ান, এবার তো তোর সুদিন। শহরে চেম্বার কর, গাড়ি কেন, মাসিকে নিয়ে আয় এখানে।” আয়ান মায়ের কাছে গিয়ে বসল। রাবেয়া তখন দাওয়ায় বসে চাল ঝাড়ছিলেন। আয়ান বলল, “মা, শহরে থাকলে আমরা খুব ভালো থাকতে পারব। তোমার আর কোনো কষ্ট হবে না।”
রাবেয়া শান্ত দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন।বললেন,
“আয়ান, তোকে ডাক্তার বানানোর পেছনে আমার শুধু একার পরিশ্রম নেই রে। এই গ্রামের ধুলো-কাদা, ওই জরাজীর্ণ হাসপাতাল যেখানে বিনা চিকিৎসায় মানুষ মরে, তাদের দীর্ঘশ্বাসও আছে। তুই যদি শহরেই হারিয়ে যাস, তবে এই গ্রামের গরিব মানুষগুলোর কী হবে? আমি তো চেয়েছিলাম তুই তাদের প্রদীপ হবি।”
মায়ের কথাগুলো আয়ানের বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে বুঝল, তাঁর মা শুধু তাঁর জননী নন, তিনি তাঁর নৈতিকতার শিক্ষকও। আয়ান সিদ্ধান্ত নিল সে গ্রামেই ফিরবে। নলডাঙ্গা গ্রামে কোনো ভালো ডাক্তার ছিল না। সামান্য জ্বরে বা গর্ভকালীন জটিলতায় অনেক মানুষ অকালে মারা যেত। আয়ান নিজের বাড়ির উঠোনেই একটা ছোট ডিসপেনসারি খুলল। নাম দিল ‘আলোর ঠিকানা’। শুরুটা সহজ ছিল না। ওষুধের খরচ জোগানো কঠিন ছিল। কিন্তু আয়ান হাল ছাড়েনি। সে তাঁর বেতনের একটা বড় অংশ দিয়ে ওষুধ কিনত। গ্রামের গরিব মানুষের কাছ থেকে সে কোনো ফি নিত না। বরং অনেক সময় নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে রোগীদের পরীক্ষা করতে শহরে পাঠাত। রাবেয়া বেগম এখন আর কাজ করেন না। কিন্তু তিনি সারাদিন ছেলের পাশেই থাকেন। রোগীদের সাথে কথা বলেন, তাদের সাহস দেন। তিনি দেখেন, তাঁর ছেলে কীভাবে একেকটা মুমূর্ষু রোগীকে সারিয়ে তুলছে। গ্রামের মানুষ এখন আয়ানকে ‘দেবদূত’ মনে করে। এক শীতের রাতে গ্রামের এক হতদরিদ্র দিনমজুর তাঁর অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে এল। মেয়েটির অবস্থা আশঙ্কাজনক। আয়ান সারা রাত জেগে চিকিৎসা করল। ভোরে যখন মেয়েটি চোখ মেলল, বাবাটি আয়ানের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। আয়ান তাঁকে তুলে জড়িয়ে ধরল এবং বলল,
“কাকা, আমি তো শুধু উপলক্ষ। ধন্যবাদ দিন আমার মাকে, যাঁর সততা আর ত্যাগের জন্য আমি আজ এখানে দাঁড়িয়ে।”
কয়েক বছর পর, রাবেয়া বেগম অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বয়সের ভার আর আজীবনের কঠোর পরিশ্রম তাঁর শরীরকে জীর্ণ করে দিয়েছিল। মৃত্যুর আগে তিনি আয়ানের হাত ধরে বলেছিলেন,
“বাবা, আমার জীবনের সব সাধ পূরণ হয়েছে। আজ আমি মরেও শান্তি পাব। শুধু মনে রাখিস, কখনও অর্থের লোভে নিজের আদর্শ বিসর্জন দিস না। এই মানুষগুলোই তোর আসল পরিবার।”
রাবেয়া বেগম চলে গেলেন, কিন্তু তিনি রেখে গেলেন এক বিশাল পরিবর্তন। আয়ান এখন আর একা নয়। তাঁর এই নিঃস্বার্থ কাজ দেখে আরও কয়েকজন তরুণ ডাক্তার গ্রামে এসে যোগ দিয়েছেন। ‘আলোর ঠিকানা’ এখন একটি পূর্ণাঙ্গ দাতব্য হাসপাতালে রূপান্তরিত হয়েছে।প্রতিদিন সকালে আয়ান যখন হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়ায়, তখন তাঁর মনে হয় কুয়াশা ভেদ করে এক টুকরো রোদেলা আকাশ হাসছে। সেই হাসিতে তিনি তাঁর মায়ের মুখ দেখতে পান। নলডাঙ্গা গ্রামের প্রতিটি ঘরে এখন আর কান্নার রোল নেই, বরং এক গর্বিত মায়ের গল্পের প্রতিধ্বনি শোনা যায়—যে মা শিখিয়েছিলেন, সত্যের পথ কঠিন হলেও তার গন্তব্য হয় স্বর্গের মতো সুন্দর। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এখন যখন স্কুলে যায়, তারা রাবেয়া বেগমের বাড়ির দিকে তাকিয়ে শপথ করে, তারাও বড় হয়ে আয়ান ডাক্তারের মতো হবে। এভাবেই এক মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম আর সততার বীজ থেকে জন্ম নিল হাজারো স্বপ্নের অরণ্য। রাবেয়া বেগম নেই, কিন্তু নলডাঙ্গা গ্রামের প্রতিটি সুস্থ মানুষের স্পন্দনে তিনি বেঁচে আছেন। তাঁর ত্যাগের মহিমা আজ সেই জীর্ণ কুটির ছাড়িয়ে দিগন্ত বিস্তৃত। মা তো এমনই হন—যিনি নিজের সবটুকু বিলিয়ে দিয়ে এক একটি আলোকবর্তিকা তৈরি করেন, যা অন্ধকার সমাজকে পথ দেখায়।


খুব সুন্দর হয়েছে। এভাবেই এগিয়ে যাক সৃষ্টিঘর।